জীবনে সফল হতে চাইলে এই ৫টি বিষয় অবশ্যই মাথায় রাখুন

আমরা অধিকাংশ মানুষকে বলতে শুনি- “জীবনে সফল হতে চাইলে অনেক বেশি পরিশ্রম কর”। তবে সফল ব্যাক্তিদের জীবন পর্যালোচনা করলে দেখা যায় তারা পরিশ্রমী হওয়ার পাশাপাশি কৌশলিও ছিলেন। সফল হওয়ার জন্য গাঁধার মতো পরিশ্রম করলেই হয় না, সঠিক দিকনির্দেশনা মেনে পরিশ্রম করতে হয়।

তাই সফলতা পেতে চাইলে কৌশলী হওয়া অনেক বেশি জরুরী। এই দিকনির্দেশনা মূলত আমরা পেয়ে থাকি সফল ব্যাক্তিদের দৈনন্দিন জীবন থেকে। তাদের সুনির্দিষ্ট কিছু অভ্যাস থেকে।

বিভিন্ন স্মরণীয় ও বরণীয় ব্যাক্তিদের জীবন পর্যালোচনা করলে কিছু সুনির্দিষ্ট অভ্যাস পাওয়া যায় যেগুলো মেনে চললে আমরাও সফলতার শিখরে পৌঁছাতে পারি। আজকে তেমন ই ৫টি অভ্যাসের কথা বলা হবে- যেগুলো গড়ে তুলতে পারলে সফলতা নামক সোনার হরিণটি আমাদের ধরা দিবে।

তাই চলুন, দেরি না করে জেনে নেওয়া যাক সেই ৫টি অভ্যাস –

০১। সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য ঠিক করুন

সফলতার সংজ্ঞা একেক জনের কাছে একেক রকম। কেউ হয়তো বা ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার হওয়াকে সফলতা মনে করে। কেউবা একজন শিক্ষক বা চাকরিজীবী হওয়াকে সফলতা মনে করে।

আমরা সবাই স্বপ্ন দেখি জীবনে ওটা করবো, সেটা করবো। তবে স্বপ্ন আর লক্ষ্য এক বিষয় না। যখন আমরা আমাদের স্বপ্ন থেকে নির্দিষ্ট কিছু আশা করবো এবং সেটার জন্য কাজ করবো তখন সেটা হবে লক্ষ্য।

উদাহরণস্বরুপ বলা যায় – আপনি ধনী হতে চান (এটা হচ্ছে আপনার স্বপ্ন)। আপনি আগামী ৫ বছরের মধ্যে ১ কোটি টাকার মালিক হতে চান (এটা লক্ষ্য)।

তাই জীবনে সফল হতে চাইলে দ্রুত লক্ষ্য ঠিক করে ফেলুন। কারণ প্রত্যেকটি সফল ব্যাক্তিদের নির্দিষ্ট লক্ষ্য ছিলো।

আপনি এমন কোনো সফল ব্যাক্তিত্ব দেখাতে পারবেন না, যার জীবনে কোনো লক্ষ্যই ছিলো না। আগে হোক বা পরে; তাদের লক্ষ্য ছিলো সুনির্দিষ্ট। যেটাকে সামনে রেখে তারা পরিশ্রম করেছেন।

তাই সফলতার অন্যতম প্রধান শর্ত হলো লক্ষ্য সুনির্দিষ্ট করা। আপনি আজ যে অবস্থানেই থাকুন না কেনো, ভবিষ্যতে নিজেকে কোথায় দেখতে চান সে বিষয়টি মাথায় রেখে আপনার লক্ষ্য নির্ধারণ করুন।

০২। নিজেকে স্বাভাবিক রুটিনের আওতায় নিয়ে আসুন ও ধারাবাহিকতা বজায় রাখুন

লক্ষ্য সুনির্দিষ্ট করার পর, সেটা পূরণের জন্য দ্রুত কাজে নেমে যাওয়া উচিত। আর তাই নিজেকে একটা স্বাভাবিক রুটিনের আওতায় নিয়ে আসুন।

রুটিন বলতে – ৭ টায় উঠবেন, ৭: ১০ ফ্রেশ হবেন, ৭:৩০ এ পড়া / কাজ শুরু করবেন, ৮:৩০ এ খেতে যাবেন, ৮:৪০ এ হাঁটাহাঁটি করবেন, ৮:৫০ এ গল্পগুজব করবেন ইত্যাদি ব্লা ব্লা, এমন কিছুই না।

এমন ঘড়ির কাঁটা ধরে রুটিন বানাতে যাবেন না। কাঁটায় কাঁটায় সব কিছু করা রোবটের পক্ষে সম্ভব, মানুষের পক্ষে কাঁটায় কাঁটায় সবকিছু করা সম্ভব না। কাজেই এরকম রুটিন বানালে ২/৩ দিন পরই ফ্রাস্ট্রেটেড হয়ে যাবেন। এবং কাজ করার ইচ্ছাশক্তি কর্পূরের মতো বাতাসে উড়ে যাবে।

একটা স্বাভাবিক রুটিন রাখুন। যেমনঃ নির্দিষ্ট সময় ঘুমোতে যান, প্রতিদিন নির্দিষ্ট পরিমাণ ঘুমান (৭/৮) ঘন্টা তার বেশি না। একটা নির্দিষ্ট সময় ঘুম থেকে উঠে পরুন এবং প্রতিদিন যাবতীয় কাজকর্ম বাদে আপনার লক্ষ্য পূরণের জন্য ৫/৬ ঘন্টা বা তার বেশি বরাদ্দ রাখুন।

এরকম একটা রুটিনের মধ্যে নিজিকে নিয়ে আসতে পারলে লক্ষ্য পূরণ অনেক বেশি সহজতর হয়ে যাবে।

এরপর আসে সবচেয়ে চ্যালেঞ্জিং বিষয়- ধারাবাহিকতা বজায় রাখা। আমাদের সবার জীবনেই কমবেশি খারাপ সময় আসে। সে সময়গুলোতে সমস্ত উৎসাহ, উদ্দীপনা শূন্যে মিলিয়ে যায়।

কাজ করার কথা চিন্তা করলেও বিরক্ত আসে। এই সময়গুলোতে কিছুই করতে ইচ্ছে করে। এসময় ধারাবাহিকতা বজায় রাখা খুবই টাফ। যারা এসময়গুলোতে ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে পারে তারাই মূলত সাফল্যের দেখা পায়।

এমন খারাপ সময় আসলে ৫/৬ ঘন্টার জায়গায় অন্ততপক্ষে ২/১ ঘন্টা জোর করে হলেও লক্ষ্য পূরণের জন্য কাজ করে যান। অন্ততপক্ষে কাজ করার ধারাবাহিকতা অব্যাহত রাখুন।

০৩। বিভিন্ন মাধ্যম থেকে জ্ঞান আহরণ করুন

সফলতা লাভের সবচেয়ে স্মুথ উপায় হলো একাডেমিক পড়াশোনা ভালোভাবে করা। একাডেমিক পড়াশোনা না করেও অনেকে সফল হয়। তবে সে পরিমাণ খুবই নগন্য, সেগুলো ব্যতিক্রম। ব্যতিক্রম কখনো উদাহরণ হতে পারে না।

আর একাডেমিক লাইফে ভালো ফলাফল করতে পাঠ্যবইয়ে দক্ষতার বিকল্প নেই। তবে সারাদিন পাঠ্যবইয়ে মুখ গুজে বসে থাকলে হবে না।

আপনি অন্যদের থেকে ভালো অবস্থানে থাকতে চাইলে অবশ্যই আপনাকে অন্যদের চেয়ে বেশি পরিশ্রম করতে হবে। অন্যদের চেয়ে বেশি জানতে হবে।

আর তাই পাঠ্যবইয়ের পাশাপাশি পাঠ্যক্রম বহির্ভূত বিভিন্ন বই পড়ুন। বিশেষ করে দেশি ও বিদেশি বিভিন্ন নন ফিকশন ও আত্মউন্নয়নমূলক বই পড়ায় বেশি জোর দিন। প্রতিদিন সংবাদপত্র পড়ুন, সবসময় আপডেট থাকুন।

কারো কথা শুনেই বিশ্বাস করার প্রবণতা বাদ দিন। নিজে যাচাই করে দেখুন।

ইউটিউবে প্রতিনিয়ত ভিডিও না দেখে আপনার লক্ষ্যের সাথে ম্যাচ করে সেরকম কিছু চ্যানেলের ভিডিও দেখুন ও সফল মানুষদের সাবস্ক্রাইব করে রাখুন। নিয়মিত তাদের ভিডিও দেখুন।

ফেইসবুকে অযথাই বিভিন্ন পেজ ও গ্রুপের সাথে কানেক্টেড না থেকে সফল ব্যক্তিবর্গদের পেজের সাথে যুক্ত থাকুন, তাদের ফলো করুন। যেকোনো কিছু খুঁটিনাটি জানার চেষ্টা করার জন্য গুগল সার্চ করার অভ্যাস করুন।

০৪। ভুল থেকে শিক্ষা নিন ও পরিশ্রমী মানুষদের আশেপাশে থাকার চেষ্টা করুন

“যে ব্যাক্তি কখনো ভুল করেনি, সে আসলে কখনো নতুন কিছু করার চেষ্টা করেনি,” -আলবার্ট আইনস্টাইন।

শেখার প্রথম ধাপই হচ্ছে ভুল করা। কাজেই দৃঢ় মনোবল নিয়ে কিছু করার সময় ভুল হলে হতাশ হওয়া যাবেনা। সবসময় ভুল করাকে শেখার একটা ধাপ মনে করতে হবে এবং ভুল থেকে শিক্ষা নিতে হবে।

আমরা জেনে, না জেনে অহড়হ ভুল করে থাকি। কিন্তু অধিকাংশ সময় সে দায়বদ্ধতা নিজের উপর নিতে চাই না। দায়ভার অন্যের উপর চাপাতে কেনো যেনো আমাদের সন্তুষ্টি লাগে।

সমস্যাটা হয় তখনই, যখন আমরা নিজের ভুলকে এড়িয়ে যেতে চাই বা অন্যের ওপর দোষ চাপাই। অন্যের ওপর দোষ চাপানো মানে, নিজের ভুলকে অস্বীকার করা, দায়ভার থেকে পালিয়ে বেড়ানো।

যখন আমরা এমন করি তখন একই ভুলের পুনরাবৃত্তি ঘটার সম্ভাবনা থাকে এবং বঞ্চিত হই কোনো গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা থেকে। যার কারণে আমাদের অগ্রগতি সম্ভব হয় না। তাই লাইফের যেকোনো স্টেজে অকৃতকার্য হলে সেটাকে স্বাভাবিকভাবে নিন।

অকৃতকার্য হওয়ার পেছনে সম্ভাব্য কারণগুলো খুঁজে বের করুন এবং সেসব ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে পুনরায় চেষ্টা চালিয়ে যান। সফলতা অবশ্যই ধরা দিবে।

আর সবসময় চেষ্টা করুন জ্ঞানী-গুণী ও পরিশ্রমী মানুষদের আশেপাশে থাকার। কারণ কথায় আছে,”সঙ্গ দোষে লোহা ভাসে”। অর্থাৎ আপনি যাদের সাথে চলাফেরা  করবেন তাদের দ্বারাই আপনি প্রভাবিত হবেন। পরিশ্রমী মানুষদের সাথে চলাফেরা করলে, আপনার পরিশ্রম করার স্পৃহাও বেড়ে যাবে। এবং সফল হওয়ার পথ প্রশস্ত হবে।

০৫। হতে হবে স্বাস্থ্য সচেতন

সাফলতার জন্য অন্যসব পয়েন্ট মেনে চললেও কেনো যেনো অধিকাংশ মানুষ এই পয়েন্টটি মিস করে যায়! অথচ এটিকেই প্রাধান্য দেওয়া উচিত সবচেয়ে বেশি।

সফলতা কোনো রাতারাতি ঘটনা না। এটি আমাদের দীর্ঘদিনের ধৈর্য, সাধনা, প্রয়াশ ও পরিশ্রমের ফল। সফলতা পেতে একটা লং-টার্ম জার্নির মধ্য দিয়ে যেতে হয়। আর এই যাত্রায় সুস্বাস্থ্য নিশ্চিত করা অনেক বেশি জরুরী।

তাই সবসময় আপনাকে স্বাস্থ্যসচেতন থাকতে হবে। সফল হওয়ার জন্য আমরা অধিকাংশ মানুষ ঘুমের ক্ষেত্রে কম্প্রোমাইজ করতে চাই বা করি। যার সাইড ইফেক্ট তৎক্ষনাৎ উপলব্ধি করতে না পারলেও পরে ঠিকই মাসুল দিতে হয়।

তাই স্বাস্থ্য সম্পর্কিত প্রতিটি বিষয়ে সচেতন হোন। প্রতিদিন ৭ / ৮ ঘন্টা ঘুমান। ৬ ঘন্টার নিচে ঘুমানো একদমই উচিত না। এটি ধীরে ধীরে আপনার মস্তিষ্কের ধারন ক্ষমতা কমিয়ে দিবে।

কাজেই কম ঘুমিয়ে একটু বেশি পরিশ্রম করলে যে আপনি অন্যদের চেয়ে অনেকবেশি সফল হয়ে যাবেন এই ধারণা বাদ দিন। এবং, সময় মতো ব্রেকফাস্ট, লাঞ্চ,ও ডিনার করুন।

সময়মতো না খেলে নানা রকমের সমস্যা দেখা দিতে পারে। পাশাপাশি প্রাত্যহিক  খাদ্যতালিকায় মাছ-মাংস, ফলমূল, ডিম, দুধ, শাকসবজি ইত্যাদি রাখুন। ছোট-বড় যেকোনো স্বাস্থ্য সমস্যা দেখা দিলে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হোন।

মূলকথা হল- সাফল্য পেতে হলে সঠিক পরিকল্পনা মোতাবেক পরিশ্রম করতে হবে। আর পরিশ্রম করার জন্য সুস্বাস্থ্য ম্যাটার করে। কারণ- “সুস্থ্য দেহ সুন্দর মন” আমরা এই নীতিতেই বিশ্বাসী।

আরও পড়ুন-

Leave a Comment