ড্রপশিপিং বিজনেস কি লাভজনক?

বর্তমান মানুষ, বিশেষ করে করোনা পরবর্তী এই মানবজাতি; প্রতিনিয়তই কেনাকাটার জন্য আরও বেশী ইন্টারনেটমুখী হয়ে উঠছেন। উদ্যোক্তাদের জন্য বিষয়টি সুবিধাজনক বটে। অফলাইনে, ছোটখাট একটি ব্যবসা করতে গেলেও যে ঝামেলাগুলোর ভেতর দিয়ে যেতে হয়, যে বিশদ আয়োজনের প্রয়োজন হয়, অনলাইনে একটি মাঝারি সাইজের ব্যবসা করতেও সেসবের প্রয়োজন হয় না। অনলাইন ব্যবসার যে বিভিন্ন ধারণা বা কনসেপ্টগুলোর কারণে এটি সম্ভব হয়েছে তার মাঝে ড্রপশিপিং অন্যতম। আজকের আলোচনায় ড্রপশিপিং বিজনেস কি লাভজনক এবং এর ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে।

মোবাইলের মাধ্যম যে পরিমাণ ই-কমার্স পণ্য বিক্রয় হয়ে থাকে তার পরিমাণ ২০১৭ সালে ছিল ৩৪.৫ শতাংশ। ধারণা করা হয়, ২০২১ সালে এই পরিমাণ দাড়াবে ৫৪ শতাংশ। ড্রপশিপিং মডেলের ব্যবসায়ীদের জন্য এটি যথেষ্টই সুসংবাদ। দেখাই যাচ্ছে, গতানুগতিক দোকানপাট বাদ দিয়ে, অনলাইনে নিমেষের মাঝে পণ্য কেনার প্রবণতা বাড়ছে ক্রেতাদের। এ বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে আপনিও ইচ্ছে করলে একটি মোবাইল ফ্রেন্ডলি ড্রপশিপিং সাইট বানিয়ে সহজেই একজন সফল ব্যবসায়ী হয়ে উঠতে পারবেন।

ড্রপশিপিং কি?

ড্রপশিপিং অনলাইন বাণিজ্য বা ই-কমার্সের এক প্রকার ব্যবসায়িক মডেল। অনলাইন বাণিজ্যের যে গতানুগতিক কাঠামোটি পাওয়া যায়, তার থেকে ড্রপশিপিং কিছুটা ভিন্নরকম।

ড্রপশিপিংয়ের ব্যবসার বৈশিষ্ট্যসমূহ

  • যে পণ্য আপনি বিক্রি করবেন, সেটির সাথে আপনি, অর্থাৎ ব্যবসায়ী, নিজেই সংস্পর্শে আসবেন না।
  • যে পণ্য আপনি বিক্রি করছেন, সেটিকে আপনি মজুদও করবেন না।
  • আপনি দোকানঘর ভাড়াও করবেন না, কর্মীও নিয়োগ দিবেন না।
  • কোন প্রকার পরিবহন ব্যাবস্থাও গড়ে তুলতে হবে না।

ড্রপশিপিংয়ের ক্ষেত্রে আপনি শুধু অনলাইনে একটি ই-কমার্স স্টোর অর্থাৎ ইকমার্স ওয়েবসাইট তৈরি করবেন। কাজটি আপনি নিজের ওয়েবসাইট বানিয়ে করতে পারেন। অথবা শপিফাই, ওয়ার্ডপ্রেস ব্যবহার করে উকমার্স (WooCommerce) এর মত প্লাটফর্মও ব্যবহার করতে পারেন।

এক্ষেত্রে আপনার ওয়েবসাইট বা অনলাইন দোকানটির একটি “নিশ” থাকবে। অর্থাৎ, আপনি একটি সুনির্দিষ্ট প্রকারের পণ্য বিক্রি করবেন। আপনার নিশ হতে পারে – জামা, জুতা, বইপত্র, মোবাইল, ল্যাপটপ ইত্যাদি।

আপনি এই নিশ এর ভিত্তিতে আপনার ক্লায়েন্ট (খদ্দের)-দের কাছে পণ্য উপস্থাপন করবেন। সেই পণ্যগুলো আপনার নিজের তৈরি করা, বা মজুদ করা পণ্য নয়। অন্যসব ভরসাযোগ্য, স্বনামে ধন্য পাইকারী বিক্রেতা এবং পণ্য উৎপাদনকারীর পণ্যই আপনার সাইট মারফত ক্রেতাদের কাছে পেশ করা হবে। আপনার মাধ্যমে ক্লায়েন্ট নিজের অর্ডারটি জানিয়ে দিবেন। এই অর্ডারটি হওয়া মাত্রই অত্যন্ত কৌশলী একটি ব্যবসায়ী প্রক্রিয়া সচল হয়ে যাবে।

ড্রপশিপিংয়ের এই প্রক্রিয়া সংবেদনশীল পণ্য বিক্রীর ক্ষেত্রে ভালোই কাজ করে। সেই সাথে উৎপাদনকারী থেকে ক্লায়েন্টের কাছে পণ্য পৌঁছে দেয়ার সময়কালটিও কমে আসে। কারণ, এখানে পণ্যগুলো কোন দোকানের তাকের ওপর অপেক্ষা করে নেই যে; কখন একজন ক্রেতা এসে তাকে কিনবেন। ক্রেতা যখন কিনতে চাচ্ছেন, তখনই সরাসরি উৎপাদনকারীর কাছ থেকে পণ্য চলে আসছে।

আপনি যখন ড্রপশিপিংয়ের ব্যবসায়িক মডেলটি গ্রহণ করবেন, তখন আপনার ব্যবসার ক্ষেত্রে দু’টি জিনিস ঘটবে-

  • কিভাবে আপনি ব্যবসা করেন, সেই বিষয়টির একটি পরিবর্তন ঘটবে।
  • আপনার প্রতিষ্ঠানের দৈনন্দিন কার্যক্রম হয়ে উঠবে অনেক বেশী গতিশীল ও জটিলতামুক্ত।

ড্রপশিপিং কিভাবে কাজ করে?

ড্রপশিপিং একটি ব্যবসাকে, খুচরা বাণিজ্যের সকল প্রকার সুবিধাগুলো উপভোগের সুযোগ করে দেয়। কিন্তু গতানুগতিক খুচরা বাণিজ্যের সাথে যে অনুষঙ্গিক ঝামেলাগুলোর যোগ আছে – যেমন, পণ্য মজুদ করা, দোকান খরচ, আনা-নেওয়া তথা পরিবহন খরচ ইত্যাদি, সেগুলোর ভেতর দিয়ে যেতে হয় না।

এখানে সবচেয়ে মজার বিষয়টি হচ্ছে, যে পণ্যসামগ্রী আপনি বিক্রী করছেন, সেই পণ্য ভান্ডারের আপনি মালিকই নন। ফলে খুচরা ব্যবসা শুরু করার আগে, লাখ লাখ টাকা বিনিয়োগ করে ব্যবসায়ীদের যে পণ্য কিনতে হয়, আপনাকে সেটি করতে হচ্ছে না।

সাধারণ ব্যবসায়ীদের ক্ষেত্রে পণ্য মজুদকরণের সাথে- বীমা, নিরাপত্তা, পণ্যের দেখভাল করা – ইত্যাদি যে খরচান্ত বিষয়গুলোর যোগ থাকে, সেগুলোও এখানে নেই।

আরেকটি বিষয় হচ্ছে, আপনার ক্রেতারা কখনই স্বশরীরে উপস্থিত হয়ে আপনার কাছ থেকে পণ্য কিনবেন না। ফলে আপনারও কোন ট্রেডিশানাল অর্থে “দোকান” বলতে যে জিনিসটা বোঝায়, তার প্রয়োজন নেই।

ড্রপশিপিং মডেলে ব্যবসা করতে আপনার মাত্র দুটো জিনিস প্রয়োজন- একটি কম্পিউটার, এবং একটি ইন্টারনেট সংযোগ। ব্যস শেষ। অতিরিক্ত উপাঙ্গ হিসেবে একটি টেবিল-চেয়ার যোগাড় করতে পারেন, যেখানে বসে কাজ করবেন আপনি।

ড্রপশিপিং বিজনেস কি লাভজনক? ড্রপশিপিং ব্যবসার ভবিষ্যৎ কি?

আপনার টাকা পয়সা তেমন নেই, বা আপনি চাকরী বা পড়াশোনার সাথে যুক্ত বিধায় হাতে সময় কম। আবার আপনি ব্যবসাও করতে চান; এরকম ক্ষেত্রে ড্রপশিপিং একটি চমৎকার উপায়। তবে জগতে কোন জিনিস যতই প্রীতিকর হোক না কেন, কিছু সমস্যা থাকেই। ড্রপশিপিং ব্যবসাও তার ব্যাতিক্রম নয়। ড্রপশিপিং মডেলে ব্যবসা করার আগে এই সুবিধা-অসুবিধাগুলো সম্পর্কে সম্যক উপলব্ধি জরুরী। তাহলেই আপনি এই ব্যবসায় সফল হতে পারবেন।

আরও পড়ুন –

ড্রপশিপিংয়ের সুবিধাগুলো

ড্রপশিপিং ব্যবসার সুবিধাসমূহ নিচে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো-

কম খরচে ব্যবসা শুরু করুন

ড্রপশিপিংয়ের একটি অন্যতম আকর্ষণ, এবং এই ব্যবসায়িক মডেলটির মূল সুবিধাগুলোর একটি হচ্ছে, ব্যবসা শুরু করতে খুবই কম টাকার প্রয়োজন হয়। এর গোটা প্রক্রিয়াটিই ইন্টারনেটে ব্যবসা করার সুবিধাগুলোর সর্বোচ্চ ব্যবহার করে। সহজ, ঝামেলাহীন এবং সবচেয়ে ভালো ফলপ্রদায়ী বিনিয়োগের সুযোগ পান ব্যবসায়ী।

ব্যবসায়িক ঝুঁকি কম

একটি খুচরা ব্যবসা শুরু করতে হলে সাধারণতঃ ব্যবসায়ীকে নির্দিষ্ট পরিমাণ পণ্য কিনতে হয় প্রথমে। এটি তার খুচরা ব্যবসার প্রাথমিক খরচ। অর্থাৎ, এটিই তার ব্যবসার প্রাথমিক ঝুঁকি। ড্রপশিপিংয়ের ক্ষেত্রে এই খরচ খুবই কম বা নেই।

যে পণ্য আপনি বিক্রী করছেন সেটি আপনার নিজেকেই কিনতে হচ্ছে না। ফলে ব্যবসার প্রাথমিক খরচ তথা ঝুঁকি অত্যান্ত কম। আপনি দোকান খুলবেন, অথচ আপনার কোন “দোকানই” নেই। আপনার কাজ একটাই। ক্রেতা খুঁজে বের করুন। এসইও’র কৌশলগুলো ব্যবহার করে এই কাজটি করতে পারেন। আপনি ক্রেতা খুঁজে দেয়ার পর বাকী সমস্ত কিছুর দ্বায়িত্ব- পণ্য সরবরাহকারী এবং ডেলিভারী সেবাগুলোর। আপনাকে কোন কিছু স্পর্শই করছে না।

অর্ডার-ফুলফিলমেন্টের ব্যয় কম

ক্রেতা পণ্য চাওয়া থেকে শুরু করে তার হাতে পৌঁছে দেয়া অবধি গোটা প্রক্রিয়াটিকে বলে অর্ডার-ফুলফিলমেন্ট। সাধারণতঃ অনলাইন ব্যবসায়ীদেরকে এই ক্ষেত্রটিতে সবচেয়ে বেশী পরিশ্রম এবং খরচ করতে হয়।

প্রোডাক্টকে ডেলিভারীর গাড়িতে উঠিয়ে বা অনলাইন-স্টোরে নিয়ে আসার আগ পর্যন্ত, তাদেরকে বেশ অনেকগুলো ধাপ পার হতে হয়। পণ্য মজুদ করা, পণ্যে প্রতিষ্ঠানের লেবেল সংযুক্ত করা, প্যাকিং করা, এবং অবশেষে পরিবহনের ব্যবস্থা করা। যথেষ্ট শ্রমসাধ্য এবং ব্যায়বহুল বিষয়।

ড্রপশিপিংয়ের ক্ষেত্রে এই সমস্ত সেবাগুলোর খরচ, ক্রেতার সাথে আপনার লেনদেনের ভেতর ধরে দেয়া হয়। ফলে, আপনার নিজেকে কিন্তু এসব কিছুই করতে হচ্ছে না। কাস্টমার পণ্য হাতে পেয়ে যে টাকা দিবেন, সেখানেই পণ্যের যোগানদাতা, পরিবহন কর্তা, প্রভৃতি সেবাদাতার ভাগ ধরা থাকবে। আপনার কাজ হচ্ছে- পণ্যর দামের ভেতরে নিজের ভাগটুকু বিচক্ষণতার সাথে নির্ধারণ করে দেয়া।

লোকসানের পরিমাণ কম

আপনাকে ব্যাবসায়ী হিসেবে পণ্য কিনতে হচ্ছে না, দোকান ভাড়া করতে হচ্ছে না, কর্মী নিয়োগ দিতে হচ্ছে না, আপনার ব্যাবায়িক এলাকার স্থানীয় কর্তাদের কাওকে চাঁদা দিতে হচ্ছে না। অর্থাৎ আপনি প্রায় বিনা খরচে ব্যবসা করছেন। এই অবস্থায় আপনি যদি লোকসানেও পড়েন, সেটি পরিমাণ আহামরি কিছু নয়। আপনি সহজেই কাটিয়ে উঠতে পাবেন সেই ক্ষতি।

আসলে, ড্রপশিপিং মডেলে, আপনার ব্যবসার প্রাথমিক খরচ মূলতঃ আপনার ই-কর্মাস সাইটটির প্রচার প্রচারণায়। আপনার প্রতিদ্বন্দী অন্য ড্রপশিপারগণ কি ধরণের জিনিস বিক্রয় করছে দেখুন। কোন পণ্যগুলো ভাল করছে শনাক্ত করুন। এভাবে বিদ্যমান ধারাটির অনুসরণ করলে, আপনার বিজ্ঞাপনেও খুব বেশী খরচ করতে হবে না। কারণ মানুষ ইতিমধ্যেই এই পণ্যগুলো খুঁজছেন। আপনি শুধু জানিয়ে দিন আপনার সাইটেই সেগুলো পাওয়া যায়।

ফ্রিল্যান্সিং সম্পর্কিত কিছু লেখা –

ড্রপশিপিং ব্যবসার সমস্যা বা অসুবিধা সমূহ

ড্রপশিপিং ব্যবসার সমস্যাগুলো ব্যবসায়ী হিসেবে আপনার চিনে নেয়া জরুরী। সমস্যাগুলো যত বেশী কাটিয়ে উঠতে পারবেন, ততই আপনার ব্যবসার সৌষ্ঠব বৃদ্ধি পাবে।

সমস্ত প্রক্রিয়ার ওপর আপনার নিয়ন্ত্রণ কম

ড্রপশিপিং মডেলে, আপনার ব্যবসার প্রায় সমস্ত প্রক্রিয়াটি তৃতীয় পক্ষের মাধ্যমে সম্পাদিত হয়। তারাই অর্ডার ফুলফিল করে আপনার ক্রেতার হাতে পণ্য পৌঁছে দেয়। এখানে আপনি নিজে কিছুই করেন না। সুতরাং স্বাভাবিক ভাবে, কোন কিছুকেই খুব বেশী নিয়ন্ত্রণের সুযোগ আপনার নেই।

এই তৃতীয় পক্ষের লোকগুলি যা যা ভুল করবে, তার সবটার দায়ভারই কিন্তু ক্রেতার কাছে আপনাকেই নিতে হবে। আপনার কোন দোষ না থাকলেও।

মুনাফার পরিমাণ কম

এটা খুব সাধারণ বিষয়। যেকোন সৎ ব্যবসার ক্ষেত্রে, আপনার লোকসানের সম্ভাবনা কম হওয়ার অর্থ, আপনার মুনাফাও কমই হবে। এমনি ব্যবসায়ীরা যখন পণ্য কেনেন, তারা পাইকারদের কাছ থেকে বিপুল পরিমাণ পন্য একসাথে কিনে থাকেন। ফলে পণ্য প্রতি তাদের খরচ হয় অনেক কম।

বাজারদরে সেই পণ্য বিক্রয়ের সময় স্বাভাবিকভাবেই তাদের লাভ থাকে অনেক বেশী। ড্রপশিপিংয়ের ক্ষেত্রে ব্যাপারটি এমন নয়। আপনি পণ্যের যে দাম নির্ধারণ করবেন, সেখানে আপনার মুনাফার অংকটা কমই থাকবে। সুতরাং আপনি যদি একই পণ্য বিক্রী করে খুচরা-ব্যবসায়ীদের সমান মুনাফা করতে চান, আপনাকে পণ্য বিক্রী করতে হবে অনেক বেশী।

ব্যাক্তি-সংঘাতের পরিমাণ বেশী

ড্রপশিপিংয়ের ব্যবসায় প্রক্রিয়াগত ঝামেলা কম। কিন্তু মানুষজনের সাথে ঝামেলা খুব বেশী হয়। এই বিষয়টি মাথায় রাখতে হবে। আপনাকে দুই ধরণের সম্পর্ক বজায় রাখতে হচ্ছে- ক্রেতার সাথে সম্পর্ক এবং পণ্য সরবরাহকারীর সাথে সম্পর্ক।

পণ্য সরবরাহকারী ভুল পণ্য সরবরাহ করতে পারেন, পরিবহনের সময় পণ্য নষ্ট হয়ে যেতে পারে, অথবা দেরীতে ডেলিভারী দিতে পারেন। এক্ষেত্রে সরবরাহকারী, ডেলিভেরী ভ্যানের কর্মী বা অন্যান্য যারা যারা সমস্যাটির জন্য দায়ী; তাদের কাউকেই কিন্তু আপনার কাস্টমার দোষী সাব্যস্ত করবে না। কাস্টমার আপনার এবং আপনার প্রতিষ্ঠানের প্রতি ক্ষোভ প্রকাশ করবেন। নেতিবাচক রিভিউ দিবেন। অথচ আপনি আপনার জায়গা থেকে নিজের সর্বোচ্চ চেষ্টাটিই হয়তো করেছেন সমস্ত কিছু ঠিক রাখার জন্য।

তাছাড়া ক্রেতা বা পণ্য যোগানদাতা কারও সাথেই আপনার দেখা হয় না। সবটাই ফোনে ফোনে, বা টেক্সট আদানপ্রদানের মাধ্যমে। সুতরাং ব্যাক্তিগত বিশ্বাস ও হৃদ্যতার সম্পর্ক গড়ে তোলারও সুযোগ নেই।

ড্রপশিপিংয়ের ক্ষেত্রে ব্যবসায়ীরা যেসব ভুল করে থাকেন

ড্রপশিপিং খুচরা ব্যবসায়ী হওয়ার সবচেয়ে সুবিধাজনক উপায়গুলোর একটি। তবে এই প্রক্রিয়া সফল হতে হলে আপনার কিছু সাধারণ ভুল-ভ্রান্তি এড়িয়ে চলা জরুরী।

পরিবহন বা শিপিঙের খরচ নিয়ে অতিরিক্ত ভাবনা

এক অঞ্চল থেকে আরেক অঞ্চলে পণ্য পরিবহনের ক্ষেত্রে শিপিং খরচ একটি গুরুত্বপূর্ণ চিন্তার বিষয়। অনেক ড্রপশিপারই এই বিষয়টি নিয়ে অতিরিক্ত দুশ্চিন্তায় ভুগে থাকেন। তবে আপনি শিপিংকে যদি খুব বেশী গুরুত্ব দিয়ে ফেলেন, দেখা যাবে আপনার ব্যাবসার মান নিয়ন্ত্রণের অন্য বিষয়গুলোতে আপনার মনযোগ বঞ্চিত হচ্ছে। সুতরাং, শিপিংয়ের বিষয়টি যথাসম্ভব সরল রাখুন।

প্রথম থেকেই একটি সাধারণ শিপিং খরচ নির্ধারণ করে দেয়া সবচেয়ে ভালো।

অর্ডার বিষয়ে যথেষ্ট তথ্য না দেয়া

আপনার ড্রপশিপিং পণ্য বিক্রয়ের ওয়েবসাইটেকে পর্যাপ্ত তথ্যে সমৃদ্ধ করুন। ক্রেতা যেন, সাইটে এসে বুঝতে পারেন, আপনার দোকান থেকে পণ্য কেনার প্রক্রিয়াটি সরল, ঝামেলাবিহীন। তারা যেন জানতে পারেন যে, অর্ডার করার পর আপনি যথাসম্ভব কম সময়ে পণ্য সরবরাহ করে থাকেন। ক্রেতাদের সামনে আপনার বিশ্বাসযোগ্যতা প্রতিপাদন করা খুবই জরুরী।

ক্রেতা তার কষ্টের টাকা দিয়ে জিনিস কিনবেন। তিনি অবশ্যই প্রমাণ দেখতে চাইতে পারেন। আপনি নিশ্চিত করুন, পণ্যের যোগানদাতা বা সাপ্লাইয়ারগণ যেন “অর্ডার স্ট্যাটাস” নিয়মিত আপডেট করে। শিপিঙের সময়কাল ও পণ্য পৌঁছে দেয়ার একটি অনুমিত তারিখ তাদেরকে দিতে হবে, যেন ক্রেতাগণ তথ্য পান পর্যাপ্ত।

ব্র্যান্ডের পর্যাপ্ত পরিচিতি তৈরী না করা

অনেক সময়ই আর সব কাজের চাপে, আপনি হয়তো পর্যাপ্ত ব্রান্ডিঙ করতেই ভুলে গেলেন। কিন্তু মনে রাখবেন, আপনার ব্রান্ড নির্মাণের জন্য , কাস্টমারদের নিয়মিত আপনার ব্র্যান্ড চোখের সামনে দেখতে পাওয়া জরুরী। ক্রেতাদের নিয়মিত এবং সর্বক্ষণ আপনার ব্র্যান্ডের কথা জানাতে হবে। সুতরাং, সাইটের যতগুলো পেজে পারেন, আপনার ব্র্যান্ডের নাম ও লোগো সংযুক্ত করুন।

অর্ডারে হ-য-ব-র-ল বাঁধিয়ে দেয়া

ড্রপশিপিং ব্যবসায় এটাই মূল বিড়ম্বনা। আপনার ক্রেতারা নিজেরাই অনেক সময় ভুলভাল পণ্য কিনে বসে থাকবেন। অথবা ভুলক্রমে কোন একটি আইটেমে ক্লিক করে ফেলবেন। অনেক সময় তারা ঠিকমতই হয়তো অর্ডার করলেন। কিন্তু পরবর্তীতে মন পরিবর্তন করে সেই অর্ডার বাতিল করে দিলেন। এরকম ক্ষেত্রে, কোন অর্ডার বাতিল হওয়ার মাত্রই আপনার সাপ্লাইয়ারকে জানিয়ে দিন। অন্যথায় ঝামেলা বাঁধবে এবং আপনার ব্যবসারই সুনাম নষ্ট হবে।

পণ্য ফেরতের জটিলতা

অনেক সময়ই ক্রেতা আপনাকে পণ্য ফিরিয়ে দিতে চাইবেন। এটি ড্রপশিপিংয়ের ব্যবসায় একটি সাধারণ ঘটনা। বিষয়টি যদি দক্ষতার সাথে সামাল দিতে না পারেন, তাহলে কিন্তু খুব গন্ডগোল বাধঁবে।

এজন্য প্রথম থেকেই পণ্য ফেরতের বিষয়টির জন্য একটি বিশদ ব্যবস্থার তৈরী করুন। ধাপে ধাপে কাজটিকে ভাগ করে দিন। সুস্পষ্ট নির্দেশনা প্রদান করুন। তাহলেই অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি এড়াতে পারবেন।

একজন ড্রপশিপারের যে গুণগুলো থাকতে হবে

কাজের প্রতি ভালোবাসা

উদ্যোক্তা হিসেবে সফল হওয়া খুবই আনন্দময় ব্যাপার। আপনার কোন বস নেই। নিজের ইচ্ছেখুশি মত চলা যায়। কিন্তু পথটি যথেষ্ট কঠিন। এখানে সব সমস্যা আপনার নিজেকেই সামলাতে হয়। বিপুল পরিমাণ ধৈর্য্য শক্তির প্রয়োজন হয়। এর ফলে অনেকেই উদ্যোক্তা হওয়ার উদ্যোগটি নিয়েও পরবর্তীতে কাজের ভয়ে পিছিয়ে পড়েন। সুতরাং, প্রথমেই জেনে রাখুন আপনাকে কি কাজ করতে হবে। সময় নিয়ে ভেবে চিন্তে বাস্তবসম্মত একটি ব্যবসায়িক পরিকল্পনা তৈরী করুন।

সাহস ও উদ্যম

ভাবনা চিন্তা প্রয়োজনীয় বটে। কিন্তু সেই ভাবনার মাঝে আত্বহারা হলেও সমস্যা। অনেকেই গবেষণা, সুযোগের অপেক্ষা; ইত্যাদিতে এত বেশী সময় ব্যায় করে ফেলেন যে তাদের আর ব্যবসাটাই করা হয় না। সুতরাং সাহস ও উদ্যম রাখুন। কর্মে ঝাঁপিয়ে পড়ুন।

সারাক্ষণ টাকার কথা ভাবুন

টাকার প্রবাহ ঠিক না থাকলে, আপনার ব্যবসা চলবে না। সুতরাং, সবসময়ই ভাবুন কিভাবে আরও টাকা আনা যায়। এই ক্ষেত্রে লোভী বা অসৎ হয়ে ওঠার কথা বলা হচ্ছে না। কিন্তু টাকা না আসলে, আপনি তো মাস খানিকের বেশী ব্যবসাই করতে পারবে না। আর ব্যবসা তো কো‌ন শখের জিনিসও নয়। পেশাদার, অর্থ উপার্জনের মনোভাব থাকা জরুরী।

ব্যবসার খাতিরে আপনি যে কাজই করে থাকেন অথবা সেখানে প্রতিটি পাই পয়সা বিনিয়োগের সময় নিজেকে প্রশ্ন করুন- “আমার ব্যবসায় টাকা নিয়ে আসার ক্ষেত্রে এই বিষয়টি কতটুকু কার্যকর?” অর্থাৎ, সারাক্ষণই আপনাকে টাকার চিন্তা করতে হবে। আর নয়তো, কয় মাস পরই দোকান বন্ধ করা ছাড়া অন্য উপায় নেই।

উদার মানসিকতা

ড্রপশিপিংয়ের মত একটি নিয়ত পরিবর্তনশীল ক্ষেত্রে ব্যবসা করতে হলে, আপনাকে মন উদার রাখতে হবে। যেকোন প্রকার পরিবর্তনকে স্বাগত জানান। সবসময়ই নতুন কৌশল গ্রহণে, নতুন পরিস্থিতিতে মানিয়ে নেয়ার জন্য প্রস্তুত থাকুন। আপনার ড্রপশিপিংয়ের ব্যবসার কোন অনুষঙ্গ যদি কাজ না করে, সেটিকে বাতিল করতে দ্বিধা করবেন না।

ধরুন, আপনি গল্প-উপন্যাসের বই বিক্রী করছেন। কিন্তু দেখা গেল, মানুষ “কিভাবে ব্যবসা করে সফল হবেন” জাতীয় বইপত্রই বেশী খুঁজছে। সেক্ষেত্রে আপনি জিদ করে থাকলে হবে না যে, আমি গল্প-উপন্যাসই বিক্রী করব। আপনি ব্যবসা বিষয়ক বইপত্র বিক্রী শুরু করুন। আপনার নিশে আপনি কিন্তু ঠিকই সফল হবেন তাহলে।

ঘুরে দাড়ানোর ক্ষমতা

প্রতিটি সফল ব্যবসাই বহু চড়াই উৎরাই পার হয়ে আসে। তারা বহুবার ব্যার্থ হয়। কিন্তু ব্যার্থ হলেই তারা সব ছেড়েছুড়ে দেন না। তারা প্রতিবার ঘুরে দাড়ান। আবারও চেষ্টা করেন। সফল ও ব্যর্থ লোকদের মাঝে মূলতঃ এটাই পার্থক্য। আপনার প্রথম ড্রপশিপিঙের উদ্যোগটি ব্যর্থ হতেই পারে। ভেঙে পড়বেন না। নতুন কোন পণ্য দিয়ে কাজ শুরু করুন। নতুনভাবে অগ্রসর হোন। সফল হবেনই।

আজ এ পর্যন্তই। পরবর্তী লেখায় ড্রপশিপিং ব্যবসা গড়ে তোলার চারটি ধাপ নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। শুভকামনা সকল উদ্যোক্তাদের জন্য। আপনাদের সবার স্বপ্ন সত্যি হোক এই কামনায় শেষ করছি।

লিখেছেন : সালেহ মুহাম্মাদ

প্রয়োজন মনে হলে পড়ে নিতে পারেন –

Leave a Comment